ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে ছিনতাই করতো ওরা

টিটি২৪ প্রতিবেদকঃ ছয় বছর আগে রাজধানীর কাফরুলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক আলমগীর হোসেনকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ এর বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। এছাড়া তাদের প্রত্যেকের ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- উত্তর কাফরুলের কামরুল ইসলাম (২৫), সুমন ওরফে চোর সুমন (২৩), এমএম সাইফুল্লাহ (৫০) ও আবু শামা। তাদের মধ্যে দুজন পলাতক। বাকি দুজন রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, আসামিরা বিভিন্ন ধরনের নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে এলাকাবাসীকে বিরক্ত করত। তাদের এসব কাজে বাধা দেয়ায় রাতে নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করে নিহতের বাসায় ইটপাটকেল ছুড়ে। ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ দিবাগত রাত পৌনে ২টায় নিহতের বাড়িতে তারা ডাব খেয়ে খোসা ছুড়ে মারে। পরে আলমগীর (নিহত) ঘটনার প্রতিবাদ করেন এবং গভীর রাতে এ রকম উৎপাত করতে নিষেধ করেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দণ্ডিতরা রাত ৪টার দিকে আবার ওই বাড়িতে যান এবং নিহতের স্ত্রী এই মামলার বাদী হাজেরা বেগমকে (৩২) বলেন, আলমগীরকে বের করে দেন তার সাথে কথা আছে। হাজেরা বেগম বলেন, আমার স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে। এ কথা বলায় দণ্ডিতরা চলে যান।

পরদিন বাড়িওয়ালা এবাদুল্লাহকে জানালে সে মীমাংসা করে দেবেন বলে জানান।

তবে মীমাংসার আগেই ১৭ মার্চ সন্ধ্যায় আলমগীরকে লাঠিসোটা, ইটপাটকেল ও বঁটি দিয়ে আক্রমণ করে। হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কিলঘুষি মারে। ধারালো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

ওই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী হাজেরা বেগম বাদী হয়ে ১৮ মার্চ কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে কামরুল ইসলাম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। মামলায় বিভিন্ন সময় ১৬ জন সাক্ষ্য দেন এবং আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন চারজন।মোস্তফা জামান একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। পূবালী ব্যাংকের বিমানবন্দর শাখা থেকে কোম্পানির  ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা তুলে আইএফআইসি ব্যাংকের উত্তরা শাখায় জমা দিতে যাচ্ছিলেন। এসময় গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে একটি প্রাইভেটকারে তুলে নেয়  ৫/৬ জন লোক। এরপর একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে অস্ত্রের মুখে মোস্তফাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা কেড়ে নিয়ে তাকে গাড়ি থেকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে দ্রুতই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

২১ অক্টোবর দুপুর দেড়টার দিকে ঘটনানি ঘটে। এরপর মোস্তফার অভিযোগের ভিত্তিতে ছায়া তদন্ত শুরু করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-১)। ঘটনার ২২ দিন পর সোমবার (১১ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিমানবন্দর এলাকার সাইটডিস রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়দানকারী  চক্রের মূলহোতা মিজানুর রহমান ওরফে বাচ্চু (৪২) ও তার সহযোগী নূর আমিন মোল্লা (৩১) এবং সজিব আহম্মেদকে (২৬)গ্রেফতার করে র‍্যাব-১। এসময় তাদের কাছ থেকে দুটি  ওয়ানশুটার গান, একটি  প্রাইভেটকার, একটি ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করা হয়। এই চক্রের আরও ৪/৫ জন এখনও পলাতক রয়েছে।

র‍্যাব-১ এর কোম্পানি কমান্ডার (সিপিসি-১) সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ডিবি পরিচয় দিয়ে ছিনতাই করতো। ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারীদের টার্গেট করতো তারা। টাকা তুলে ব্যাংক থেকে কেউ বের হওয়ার পর ডিবি পরিচয়ে অপহরণ করে  নির্জন জায়গায় নিয়ে টাকা রেখে তাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যেত।

তিনি বলেন, এ চক্রের মূলহোতা বাচ্চুসহ তিনজনকে আমরা আটক করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এই চক্রের নেতৃত্বে থাকা শ্যামল ওরফে সবুজ ওরফে সুলতানসহ ৪/৫ জন পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, চক্রটি ২০১৮ সাল থেকে অপধারমূলক কাজ করে আসছে।  তাদের দলে ৮/১০ জন রয়েছে। শ্যামল ও মিজানুর পুরো চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করতো। তারা ডিবি পরিচয়ে দিয়ে ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি ও অপহরণ করতো। এজন্য ডিবি জ্যাকেট, ওয়াকিটকি ব্যবহার করতো। তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ১০-১২টি অপরাধমূলক কাজ করেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে বাচ্চু জানায়, সে আগে একটি বেসরকারি ফার্মে চাকরি করতো। এরপর গার্মেন্টসের সোয়েটার কেনাবেচা করতো। তার বন্ধু শ্যামলকে নিয়ে এই চক্রটি গঠন করে।

চক্রের অপর সদস্য নূর আমিন মোল্লা পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, ছিনতাই করতে প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে আসতো সে। এজন্য পেতো ২০ হাজার টাকা। টাকার লোভে শ্যামলের মাধ্যমে এই চক্রে জড়ায় সে।

জিজ্ঞাসাবাদে সজিব আহম্মেদ জানায়, সেপ্টেম্বরে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সে। তার কাজ ছিল টার্গেটে করা ব্যক্তিকে গাড়িতে ওঠানো। এজন্য প্রতি অপারেশনে ৩০ হাজার টাকা পেতো সে।

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে.কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই চক্রটি বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের অপহরণ ও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করতো। চক্রের সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে থাকতো। একজন ব্যাংকের ভেতরে গ্রাহকদের টার্গেট করতো। বেশি টাকা উত্তোলনকারীর বিষয়ে চক্রের সদস্যদের কাছে তথ্য দিতো। এরপর বাইরে থাকা সদস্যরা ওই ব্যক্তি ফলো করে ডিবি পরিচয় দিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে  টাকা ছিনিয়ে রেখে নির্জন স্থানে তাকে ফেলে দিত।

তিনি বলেন, তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

টিটি২৪/জা নি/আ হা/৩৯

ঢাকা আবহাওয়া
০১ জানুয়ারি, ১৯৭০
ফজর
জোহর
আসর
মাগরিব
ইশা
সূর্যাস্ত : ৬:০৬সূর্যোদয় : ৫:৪৪

আর্কাইভ